বুধবার, ১৩ মে ২০২৬
ছবি
বুধবার, ১৩ মে ২০২৬ | ৩০ বৈশাখ ১৪৩৩
কালের দিশা - Kaler Disha | Latest Bangla News | সর্বশেষ সংবাদ
সর্বশেষ

সোশ্যাল মিডিয়া কি সংঘাতের নতুন হাতিয়ার? তাত্ত্বিক ও বাস্তব বিশ্লেষণ

অ্যালগরিদম ও গুজবের ফাঁদে বিপন্ন জননিরাপত্তা; ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের অন্ধকার দিক ও উত্তরণের পথ

ডিজিটাল বিপ্লবের এই যুগে সোশ্যাল মিডিয়া বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে বলা হয় এক 'দ্বিমুখী তলোয়ার'। এটি একদিকে যেমন নাগরিক অধিকার ও সামাজিক পরিবর্তনের শক্তিশালী হাতিয়ার, অন্যদিকে তেমনি এটি রূপান্তরিত হয়েছে ঘৃণা, বিভাজন ও ভয়াবহ সহিংসতার উর্বর ক্ষেত্রে। টোডা পিস ইনস্টিটিউটের গবেষণা এবং আধুনিক তাত্ত্বিক কাঠামো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সামাজিক মাধ্যম কেবল বিনোদনের ক্ষেত্র নয়, বরং এটি সক্রিয়ভাবে সংঘাতের পথ প্রশস্ত করছে।

​তাত্ত্বিক সংকটে সমাজ: শোশানা জুবফের ‘নজরদারি পুঁজিবাদ’ (Surveillance Capitalism) তত্ত্ব অনুযায়ী, ফেসবুক বা এক্স-এর মতো প্ল্যাটফর্মগুলো ব্যবহারকারীর আবেগ নিয়ে ব্যবসা করে। এখানে রাগ, ভয় এবং ঘৃণাই সবচেয়ে বেশি প্রচার পায়, কারণ এগুলো মানুষকে বেশিক্ষণ অনলাইনে আটকে রাখতে পারে। অ্যালগরিদমের এই কারসাজি মানুষকে ‘ইকো চেম্বার’ বা প্রতিধ্বনি কক্ষে বন্দি করে ফেলে, যেখানে ভিন্নমতের কোনো স্থান নেই। হাবেরমাসের ‘পাবলিক স্ফিয়ার’ তত্ত্বে যে যুক্তিনির্ভর আলোচনার কথা বলা হয়েছিল, সোশ্যাল মিডিয়া আজ সেই ক্ষেত্রকে গুজব ও ব্যক্তিগত আক্রমণের মাধ্যমে কলুষিত করছে।

​গুজব থেকে মব লিঞ্চিং: সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়ানো ‘ডিসইনফরমেশন’ বা পরিকল্পিত মিথ্যা তথ্য এখন বৈশ্বিক হুমকি। ভারত ও ব্রাজিলে ছেলেধরা গুজবে গণপিটুনিতে মৃত্যুর ঘটনা থেকে শুরু করে বাংলাদেশের রামু, ভোলা কিংবা সাম্প্রতিক ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন পরবর্তী সহিংসতা—প্রতিটি ক্ষেত্রেই সামাজিক মাধ্যম আগুনের মতো কাজ করেছে। বিশেষ করে মাইনরিটি বা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা ও ব্যক্তিগত চরিত্রহননের জন্য ‘হানি ট্র্যাপ’-এর মতো নোংরা কৌশল আজ ডিজিটাল মাধ্যমেই সবচেয়ে বেশি কার্যকর হচ্ছে।

​রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডা ও অ্যালগরিদমের ফাঁদ: AUTHORITARIAN বা কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রগুলো আজ সোশ্যাল মিডিয়াকে দমনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ছড়ানো কিংবা ভেনেজুয়েলায় ‘ট্রোল আর্মি’র সক্রিয়তা এর বড় প্রমাণ। প্ল্যাটফর্মগুলোর ব্যবসায়িক মডেল মূলত বিজ্ঞাপনের ওপর নির্ভরশীল, যা উত্তেজক কনটেন্টকে বেশি প্রচার দেয়। এর ফলে সামাজিক মূল্যবোধ বিসর্জন দিয়ে তৈরি হচ্ছে নতুন নতুন সংঘাত।

​উত্তরণের উপায়: এই ডিজিটাল অন্ধকার থেকে মুক্তি পেতে প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণের চেয়েও বেশি প্রয়োজন সচেতনতা। নাগরিকদের ডিজিটাল সাক্ষরতা বাড়ানো, প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর অ্যালগরিদমে স্বচ্ছতা আনা এবং শান্তি ও সহনশীলতার বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া এখন সময়ের দাবি। জবাবদিহিহীন সোশ্যাল মিডিয়া গণতন্ত্রের জন্য এক বড় হুমকি। তাই সময় এসেছে সম্মিলিতভাবে প্রযুক্তিকে সংঘাতের বদলে শান্তি ও সংহতির বাহন হিসেবে গড়ে তোলার।

খুঁজুন