বাংলাদেশের ভূ-খণ্ডের প্রায় ১১ শতাংশ এলাকা নিয়ে গঠিত পার্বত্য চট্টগ্রাম আজ এক অদ্ভূত প্রশাসনিক ও আইনি শূন্যতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। স্বাধীনতার পাঁচ দশকেরও বেশি সময় পার হলেও এই বিশাল জনপদে এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর ক্যাডাস্ট্রাল সার্ভে বা ভূমি জরিপ সম্পন্ন হয়নি। ফলে রাষ্ট্র যেমন প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, তেমনি অঞ্চলটি জাতীয় নিরাপত্তার জন্য এক চরম ঝুঁকি হিসেবে দেখা দিচ্ছে।
সম্প্রতি সরকারের পক্ষ থেকে ভূমি প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন সরকারি জমি পুনরুদ্ধার ও রাজস্ব নিশ্চিত করতে জিরো-টলারেন্স নীতি ঘোষণা করেছেন। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে, যেখানে ভূমির কোনো আধুনিক ডিজিটাল ডাটাবেজ বা দালিলিক রেকর্ড নেই, সেখানে অবৈধ দখলদারদের চিহ্নিত করা কতটা সম্ভব? পাহাড়ে এক শ্রেণির প্রভাবশালী গোষ্ঠী ও আঞ্চলিক সংগঠনগুলো বছরের পর বছর ধরে ভূমি জরিপের বিরোধিতা করে আসছে। তাদের এই বিরোধিতার আড়ালে মূলত পাহাড়কে রাষ্ট্রের মূলধারার আইনি কাঠামোর বাইরে রাখার একটি গভীর কৌশল কাজ করছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।
পার্বত্য চট্টগ্রামের এই ভূমি জটিলতা কেবল অর্থনৈতিক বঞ্চনার বিষয় নয়, এর সাথে জড়িত রয়েছে গভীর ভূ-রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র। প্রথাগত আইনি কাঠামোর দোহাই দিয়ে এবং আন্তর্জাতিক কিছু সনদের অপব্যাখ্যা দিয়ে এখানে রাষ্ট্রের সার্বভৌম ক্ষমতাকে সংকুচিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। একটি বিশেষ মহল চায় না পাহাড়ের প্রতিটি ইঞ্চি আধুনিক ম্যাপের আওতায় আসুক; কারণ জরিপ সম্পন্ন হলে তাদের অবৈধ ক্যাম্প ও আধিপত্য টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।
তাই জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে এবং রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির জন্য পার্বত্য এলাকায় অবিলম্বে ড্রোন ও স্যাটেলাইট প্রযুক্তির মাধ্যমে ডিজিটাল ভূমি জরিপ শুরু করা অপরিহার্য। ব্রিটিশ আমলের সামন্ততান্ত্রিক প্রথা ভেঙে সংবিধানের আলোকে সমতল ও পাহাড়ে অভিন্ন ভূমি আইন কার্যকর করা গেলেই কেবল একটি স্থিতিশীল ও সমৃদ্ধ পার্বত্য চট্টগ্রাম গড়ে তোলা সম্ভব হবে। অন্যথায় এই জরিপহীন অন্ধকার ব্যবস্থা রাষ্ট্রের অখণ্ডতার জন্য ভবিষ্যতে আরও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।