বুধবার, ১৩ মে ২০২৬
ছবি
বুধবার, ১৩ মে ২০২৬ | ৩০ বৈশাখ ১৪৩৩
কালের দিশা - Kaler Disha | Latest Bangla News | সর্বশেষ সংবাদ
সর্বশেষ
মানবিকতার সেতুবন্ধন

মিয়ানমারের প্রাকৃতিক দুর্যোগে বাংলাদেশের বন্ধুত্বের হাত

২০০৮ সালের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় ‘নার্গিস’ থেকে ২০২৫-এর ভূমিকম্প—প্রতিবেশীর বিপদে যেভাবে বারবার পাশে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশ ও সশস্ত্র বাহিনী।

২০০৮ সালের ২ মে দিবাগত রাত ও ৩ মে ভোরে মায়ানমারের ওপর বয়ে যায় প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় ‘নার্গিস’। এই ঘূর্ণিঝড়ের ব্যাপকতা এত তীব্র ছিল যে এতে প্রায় ১ লাখ ৩৮ হাজার মানুষ মৃত্যুবরণ করে এবং বাড়িঘর এবং সম্পদের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি সাধিত হয়।  

মায়ানমারের উপকূলে ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় নার্গিসের আঘাতে প্রায় ২০ থেকে ৩০ ফুট উচু জলোচ্ছ্বাস আছড়ে পড়ে। ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের আঘাতে ইরাওয়াদি বা ইরাবতী অববাহিতা লণ্ডভণ্ড হয়ে যায়।

লাখ লাখ মানুষ খাদ্য, খাবার পানি ও প্রাণরক্ষাকারী ওষুধের অভাবে মৃত্যুর মুখে পড়ে। এটি ছিল, মায়ানমারের ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ।

এই প্রেক্ষিতে তৎকালীন বাংলাদেশ সরকার প্রতিবেশী মায়ানমারের ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে থাকার লক্ষ্য নিয়ে কিছু ত্রাণসামগ্রী ও একটি মেডিক্যাল টিম মায়ানমারে পাঠিয়েছিল।

এ ছাড়া এই লেখায় ২০১৫, ২০২৩ ও ২০২৫-এর প্রাকৃতিক দুর্যোগের পর ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য মায়ানমারে ত্রাণসামগ্রী পাঠানোর বিষয়টিও সংক্ষেপে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ধরনের মানবিক কর্মকাণ্ড/মিশন দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়ন ও মায়ানমারের জনগণের কাছে বাংলাদেশের ইমেজ বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। একে জনকূটনীতি (পাবলিক ডিপলোমেসি) ও সামরিক কূটনীতির (ডিফেন্স ডিপলোমেসি) ভালো উদাহরণ বলা যায়।

ত্রাণসামগ্রী নিয়ে ইয়াঙ্গুনে (রেঙ্গুন) বাংলাদেশের সামরিক প্রতিনিধিদল ৭ মে ২০০৮

প্রতিবেশী দেশের জনগণের দূর দশা লাঘবের জন্য ৭ মে তারিখে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল তসলিম উদ্দিন খান (আর্মড ফোর্সেস ডিভিশনে কর্মরত)-এর নেতৃত্বে ৫ সদস্যের একটি সামরিক প্রতিনিধিদল বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে ত্রাণসামগ্রী নিয়ে ইয়াঙ্গুনে যায়। ত্রাণসামগ্রীর মধ্যে ছিল আলু, ওষুধ, খাবার স্যালাইন, পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট, বিভিন্ন ধরনের কাপড়চোপড় ইত্যাদি।

দলটি ঘূর্ণিঝড়ে যান ও মালের ক্ষয়ক্ষতির জন্য মায়ানমার কর্তৃপক্ষের কাছে সমবেদনা ও সহমর্মিতাও প্রকাশ করে। উল্লেখ্য, ৭ মে তারিখে থাইল্যান্ডও (রেডক্রসের মাধ্যমে) ইয়াঙ্গুনে ত্রাণসামগ্রী পাঠিয়েছিল। এটাই ছিল মায়ানমারে বিদেশ থেকে আসা প্রথম দিকের ত্রাণ তৎপরতা। 

সে সময় মায়ানমারের বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত ছিলেন মেজর জেনারেল আবু রুশদ রোকনউদদৌলা এবং ডিফেন্স অ্যাটাশে (ডিএ) বা প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা ছিলেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ এন এম শওকত জামাল। রেঙ্গুনে মায়ানমার কর্তৃপক্ষের কাছে ত্রাণ সামগ্রী হস্তান্তর করেছিলেন বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত।

অনেক দিন পর মিরপুর ডিওএইচএস এর পার্ক ‘জ্যোৎস্না সরোবরে’ এই ঘটনা বিস্তারিতভাবে শুনবো চৌকস সেনা কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শওকত জামাল এর কাছ থেকে। ঘূর্ণিঝড় নার্গিস নিয়ে তিনি বলেন, ‘ঘটনার প্রায় ৭ দিন পর ইয়াঙ্গুনে অবস্থানরত বিদেশি ডিফেন্স অ্যাটাশেদের হেলিকপ্টারে করে ঘূর্ণিঝড় আক্রান্ত ইরাওয়ার্দী রিজিয়নে ঘুরিয়ে আনা হয়। বাংলাদেশের ত্রাণ সহায়তা পেয়ে মায়ানমার কর্তৃপক্ষ তখন কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছিলেন।’

মায়ানমারে বাংলাদেশের মেডিক্যাল টিম- ২১ মে ২০০৮ 

এই দলটির পাশাপাশি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর আর্মি মেডিক্যাল কোরের (এএমসি) লে. কর্নেল আনোয়ারুল কবীর, (পরে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ও এনডোক্রাইনোলোজিস্ট) এর নেতৃত্বে সামরিক ও অসামরিক সদস্যের সমন্বয়ে ৩৩ জনের একটি মেডিক্যাল টিম মায়ানমারে দুর্গতদের চিকিৎসা সহায়তা প্রদান করে। টিমের সাথে সব ধরনের প্রয়োজনীয় ঔষধ, পানি, খাবার স্যালাইন, পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেটসহ ১১ টন জরুরি চিকিৎসা ও ত্রাণ সামগ্রী ছিল। মেডিক্যাল টিমটি বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর পরিবহন বিমানযোগে ২১ মে মায়ানমারে পৌঁছায় এবং প্রায় দুই সপ্তাহ দায়িত্বপালনের পর ৪ জুন ঢাকায় ফেরত আসে।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মেডিক্যাল টিমটি ইরাওয়ার্দি রিজিওনের মাওবিন ও ওয়াকেমা শহরে হাজার হাজার রোগীর চিকিৎসা প্রদান করে। স্থানীয় জনগণ বাংলাদেশ মেডিক্যাল টিমের মানবিক কর্মকাণ্ডে তাদের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে।

অ্যাকশন এইড ও একজন শিহাব উদ্দিন আহমেদ

ঘূর্ণিঝড় নার্গিস আঘাত হানার পর যুক্তরাজ্যভিত্তিক আন্তর্জাতিক উন্নয়ন প্রতিষ্ঠান ‘অ্যাকশন এইড মায়ানমার’ ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। স্থানীয় অংশীদার এবং সম্প্রদায়ের সাথে মিলে তারা হাজার হাজার মানুষের কাছে জরুরি সহায়তা পৌঁছে দেয়। বাংলাদেশের শিহাব উদ্দিন আহমেদ তখন অ্যাকশন এইড মায়ানামারে কান্ট্রি ডিরেক্টর হিসেবে কাজ করছিলেন। 

শিহাব উদ্দিন আহমেদ ও তাঁর টিম (প্রায় ২৫০ স্থানীয় কর্মী ও স্বেচ্ছাসেবক) ঘূর্ণিঝড়ে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত টাউনশীপ লাবুত্তাসহ নাপুদা, প্যাপন ও বোগালে এলাকায় কাজ করেন।

 সীমান্ত শহর মংডুতে ত্রাণ সামগ্রী নিয়ে বিডিআর প্রতিনিধি দল- ৮ মে ২০০৮ 

এই সময় আমি টেকনাফে অবস্থিত ৪২ রাইফেল ব্যাটালিয়ানে সদ্য যোগদান করেছি। তবে তখনও অধিনায়কের দায়িত্ব গ্রহণ করিনি। কক্সবাজারের পার্শ্ববর্তী রাখাইন অঞ্চল ঘূর্ণিঝড়ে আক্রান্ত হয়নি। তবে ঐ পরিস্থিতিতে, বাংলাদেশ রাইফেলস বা বিডিআর কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে যে, বিডিআরের পক্ষ থেকেও মায়ানমারের সীমান্তরক্ষী বাহিনী নাসাকার (বর্তমানে বর্ডার গার্ড পুলিশ বা বিজিপি) কাছে কিছু ত্রাণ সামগ্রী পাঠানো হবে। এই সময় বিডিআরের মহাপরিচালক ছিলেন মেজর জেনারেল শাকিল আহমেদ। 

এই অবস্থার প্রেক্ষিতে, ৮ মে ২০০৮ তারিখে বিডিআর এর পক্ষে থেকে কিছু ত্রাণ সামগ্রী মংডুতে পাঠানো হয়। মংডু শহরটি টেকনাফের দক্ষিণে অবস্থিত শাহপরী দ্বীপের পূর্বে (নাফ নদীর ওপারে) অবস্থিত। মংডু রাখাইন রাজ্যের একটি জেলা শহর। 

বাংলাদেশ থেকে সড়ক পথে এসব ত্রাণ সামগ্রী সরবরাহ করার সিদ্ধান্ত হয়। সে সময় কক্সবাজারের টেকনাফে অবস্থিত ৪২ রাইফেল ব্যাটালিয়ান এসব ত্রাণ সামগ্রী নাফ নদী অতিক্রম করে মংডু দিয়ে মায়ানমার সীমান্তরক্ষী ‘নাসাকার’ কাছে হস্তান্তর করার ব্যবস্থা করে। এই সময় বিডিআরে চট্টগ্রাম সেক্টরের কমান্ডার ছিলেন কর্নেল সৈয়দ ইউসুফ মাহবুব আলী, (পরে মেজর জেনারেল ) এবং ৪২ রাইফেল ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক ছিলেন লে. কর্নেল মো. আহসান হাবিব খাঁন (পরে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল)। ত্রাণ সামগ্রী হস্তান্তর করতে সেক্টর কমান্ডার, ব্যাটালিয়ান কমান্ডার ছাড়াও ৪২ রাইফেল ব্যাটালিয়নের উপাধিনায়ক মেজর জাহিদুর রহমান ও চট্টগ্রাম সেক্টরের জেডএফএসও মেজর মোকাম্মেল হোসেন মংডু গিয়েছিলেন।

নার্গিস আক্রান্ত মানুষের পাশে- বই এর পাতা থেকে

বাংলাদেশ রাইফেলস দলের সঙ্গে কক্সবাজারের বিশিষ্ট সাংবাদিক ও লেখক মুহাম্মদ নূরুল ইসলামও মংডু গিয়েছিলেন। এই বিরল অভিজ্ঞতা লেখক তাঁর গ্রন্থে (আরাকানের পথে পথে) উল্লেখ করেছেন। 

‘সকাল প্রায় সাড়ে ৯টার দিকে (কক্সবাজার থেকে) টেকনাফে পৌঁছে যাই। টেকনাফে পৌঁছে কালবিলম্ব না করে রেসকিউ বোটে উঠে পড়ি এবং মংডুর উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করি। রেসকিউ বোট সকাল সাড়ে ১০টার মধ্যেই মংডু টাউনশিপের মাইউ নদীর জেটি ঘাটে গিয়ে পৌঁছে। বার্মার সীমান্তরক্ষী  নাসাকা বাহিনীর এরিয়া কমান্ডার ও মংডু সীমান্ত ইমিগ্রেশন হেড্কোয়াটারের পরিচালক উ অং গ্রী’র নেতৃত্বে বাংলাদেশ দলকে অভ্যর্থনা জানায়।

মাইউ নদীর তীরে কাস্টমস ঘাটে হালকা আপ্যায়নের পরে আমাদের নিয়ে যাওয়া হয়, জেটিঘাট সংলগ্ন ‘দিবানদি বা ডিবানডি হলে’।’দিবানদি হলে’ বাংলাদেশের বিডিআরের ঔষধসামগ্রী হস্তান্তর উপলক্ষ্যে এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে ১৫ সদস্যের বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের নেতা ও বিডিআরের চট্টগ্রাম সেক্টরের অধিনায়ক কর্নেল মাহবুব আলী আনুষ্ঠানিকভাবে ত্রাণ সামগ্রী মায়ানমার সরকারের পক্ষে নাসাকা প্রতিনিধি দলের নেতার হতে হস্তান্তর করেন। মায়ানমার সরকারের পক্ষে মংডু সীমান্ত হেডকোয়াটারের  ইমিগ্রেশন পরিচালক উ অং গ্রী ত্রাণসামগ্রী গ্রহণ করেন। বৈঠকে ১০ সদস্য বিশিষ্ট মায়ানমার প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন মংডু সীমান্ত ইমিগ্রেশন হেডকোয়ার্টারের পরিচালক উ অং গ্রী। বাংলাদেশ রাইফেলস-এর প্রতিনিধিদল সাহায্য হিসেবে জীবন রক্ষাকারী ঔষধ, খাবার স্যালাইন ও বিশুদ্ধ পানি প্রদান করেন।

মায়ানমার প্রতিনিধি দলের নেতা তাঁর বক্তব্যে বলেন, ‘বাংলাদেশের জনগন এবং বাংলাদেশ সরকার ঘূর্ণিঝড় আক্রান্ত মায়ানমারের জনগণের প্রতি সহানুভূতি এবং ক্ষতিগ্রস্ত জনগণের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন এই জন্য মায়ানমার সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।’

ঘূর্ণিঝড় নার্গিসের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত লোকজনের জন্য প্রদত্ত ত্রাণ সামগ্রীর মধ্যে ছিলো প্রায় ১১ হাজার বোতল বিশুদ্ধ মিনারেল ওয়াটার, এক লাখ ৭ হাজার পিছ নাপা ট্যাবলেট ও ৩০ হাজার ওর স্যালাইন।

আরাকানের পথে পথে- মুহাম্মদ নূরুল ইসলাম

আমি তখন টেকনাফের ৪২ রাইফেল ব্যাটালিয়নে সদ্য যোগদান করেছি। ৮ মে তারিখে দাপ্তরিক কাজে চট্রগ্রামে অবস্থান করছিলাম। তবে চট্টগ্রাম থেকে ত্রাণ সামগ্রী টেকনাফে পাঠানোর কাজে কিছুটা যুক্ত হওয়ার আমার সুযোগ হয়েছিল। চট্টগ্রামের এশিয়াটিক কটন মিলে (তখন বন্ধ) অবস্থিত গোডাউন থেকে পানি, খাবার স্যালাইন, খাদ্য সামগ্রী ইত্যাদি চট্টগ্রাম থেকে টেকনাফ পাঠানো হয়েছিল। 

২০০৮ সালের ২ জুন তারিখে মংডুতে দুই বাহিনীর মধ্যে ফ্ল্যাগ মিটিং বা পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। নাসাকার পক্ষে প্রতিনিধিত্ব করেন ডেপুটি ডিরেক্টর মিন শোয়ে (৬নং সেক্টর)। এটা ছিল আমার প্রথম ফ্ল্যাগ মিটিং- নতুন ধরনের অভিজ্ঞতা। আমরা টেকনাফ থেকে নাফ নদী পেরিয়ে প্রায় সকাল ১০ টায় মংডু শহরে পৌঁছাই। শহরের চেম্বার অফ কমার্স হলে মিটিংটি অনুষ্ঠিত হয়। প্রথম দর্শনেই ডেপুটি কমান্ডার মিন শোয়ে বিশেষ উষ্ণতা ও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে ত্রাণ সামগ্রী পাঠানোর বিষয়টি তখন উল্লেখ করেছিলেন।

মায়ানমারে বাংলাদেশের আরো কয়েকটি মানবিক কর্মকাণ্ড/মিশন

বাংলাদেশ সবসময়ই প্রতিবেশী দেশ হিসেবে মায়ানমারের বিপদে পাশে দাঁড়িয়েছে। ঘূড়িঝড় নার্গিসের পর মায়ানমারের মানুষ আরো ৩টি প্রাকৃতিক দুর্যোগে (বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ও ভূমিকম্প) আক্রান্ত হলে বাংলাদেশ তখন সে দেশে মানবিক সহায়তা প্রদান করেছে।

ক) ২০১৫ সালে মায়ানমারের বন্যায় বাংলাদেশের মানবিক সহায়তা- আগষ্ট ২০১৫।

খ) ২০২৩ সালে ঘূর্ণিঝড় ‘মোখার’ পর মায়ানমারে ত্রাণ সহায়তা প্রদান-  জুন ২০২৩।

গ) ২০২৫ সালে মায়ানমারে ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তায় বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী- ৩০ মার্চ ২০২৫।

মানবিক সহায়তার প্রভাব ও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক উন্নয়নে ভূমিকা

এই ধরনের মানবিক উদ্যোগগুলো মায়ানমারে অনেক প্রভাব রাখতে এবং দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।

মায়ানমার বাংলাদেশের অন্যতম প্রতিবেশী দেশ হলেও বিভিন্ন কারণে বাংলাদেশের জনগণের সঙ্গে মায়ানমারের জনগণের সম্পর্ক গড়ে ওঠেনি। প্রতিবেশী হলেও রয়ে গেছে অচেনা। মায়ানমারের সরকার ও জনগণের অনেকে বাংলাদেশ সম্পর্কে অনেক নেতিবাচক ধারণা পোষণ করে থাকে। সেসব ভুল ধারণা ভাঙাতে হবে।

মায়ানমারে বাংলাদেশের মানবিক কার্যক্রমগুলো সেসব ভুল ধারণা ভাঙাতে সহায়ক হতে পারে। এই জন্য মায়ানমারে ব্যাপকভাবে পাবলিক ডিপলোমেসি বা জনকূটনীতি পরিচালনা করতে হবে। কোন কোন রাষ্ট্রদূত ও কূটনীতিক মায়ানমারে দায়িত্ব পালনকালে পাবলিক ডিপলোমেসির বিষয়টি গুরুত্ব দিয়েছিলেন এবং বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন। এর মধ্যে রাষ্ট্রদূত মোহাম্মদ সুফিউর রহমান অন্যতম।

যদিও রাজনৈতিক ও কৌশলগত সমস্যাগুলো রাতারাতি সমাধান সম্ভব নয়, তবে বাংলাদেশের এই ধারাবাহিক মানবিক সহায়তা মিয়ানমারের সাথে একটি মর্যাদাপূর্ণ ও সহযোগিতামূলক সম্পর্কের নতুন পথ তৈরি করতে পারে। এটি প্রমাণ করে যে বাংলাদেশ কেবল সংকটের অংশ নয়, বরং সংকটের সমাধানেও অংশীদার হতে চায়।

শেষের কথা

২০০৮, ২০১৫, ২০২৩ ও ২০২৫ সালে মায়ানমারে বাংলাদেশের মানবিক কর্মকাণ্ড/মিশনে জড়িত বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর সদস্য, বিজিবির সদস্য, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কূটনীতিকবৃন্দ, চিকিৎসক, বেসামরিক ব্যক্তিবর্গ এবং মানবিক মিশনে সংশ্লিষ্ট সবার অবদান শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি। যারা সে সময়ে ঝুঁকি নিয়ে ও অক্লান্ত পরিশ্রম করে মায়ানমারের বিপন্ন মানুষের কাছে বাংলাদেশের প্রতিনিধি হয়ে ত্রাণসামগ্রী পৌঁছে দিয়েছিলেন। মানবতার ডাকে সাড়া দিয়েছিলেন। 

সেই সময়ে মায়ানমারে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত, ডিফেন্স অ্যাটাশে, বাংলাদেশ দূতাবাসের কূটনীতিক এবং দূতাবাসের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ অসাধারণ ভূমিকা পালন করেছেন। এছাড়াও মায়ানমারে বিশেষত ইয়াংগুনের বাংলাদেশ কমিউনিটির ভূমিকাও ছিল প্রশংসনীয়। 

প্রতিবেশী দেশের জনগণ বিপদে পড়লে সাহায্য করার এই ধরনের মানবিক কর্মকাণ্ড/মিশন অব্যাহত রাখা উচিত। যা বাংলাদেশের মানুষের ঐতিহ্যের অংশ। আগামীতে, বাংলাদেশ-মায়ানমার সম্পর্কের অনালোচিত কিছু দিক নিয়ে লেখার আশা রাখি।

বলা হয়, মায়ানমার একটি খোলা বই, যা বাংলাদেশের মানুষ পড়ে না। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে শুরু হোক নতুন উদ্যোগ। দুই দেশের জনগণের মধ্যে সম্পর্ক বাড়াতে হবে। আমাদের মায়ানমার চর্চা বাড়ানোও জরুরি। বাংলাদেশ-মায়ানমারের সম্পর্ক বিকশিত হোক নতুন আলোয়।

খুঁজুন